তােমার কলেজে ১৫ই আগস্ট জাতীয় শােক দিবস উপলক্ষ্যে প্রধান অতিথির এক মঞ্চ ভাষণ তৈরি কর-ভাষণ

তােমার কলেজে ১৫ই আগস্ট জাতীয় শােক দিবস উপলক্ষ্যে প্রধান অতিথির এক মঞ্চ ভাষণ তৈরি কর।

অথবা, জাতীয় শােক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির একটি ভাষণ তৈরি কর।

আজ জাতীয় শােক দিবসের আলােচনায় আমি বিনম্র চিত্তে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছিবাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীনতার রূপকার, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি এবং সেই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ১৫ই আগস্টের কালরাতে ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত তাঁর পরিবারবর্গকে।

প্রিয় সুধীবৃন্দ

সম্মানিত সভাপতি মঞ্চে উপবিষ্ট বিজ্ঞ আলােচকগণ; সবার কাছেই আমার প্রশ্ন কী অপরাধ করেছিল বঙ্গবন্ধু? জানি আমার মতাে আপনারাও দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এর কোনাে জবাব পাবেন না; পৃথিবীর কোথাও এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। টুঙ্গিপাড়ার সন্তানটি জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময় জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। বাঙালির স্বাধিকার আর স্বাধীনতা আন্দোলনে যিনি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটানাের এক মহান ব্রতে যার কেটে গেছে বিনিদ্র রজনি। পাকিস্তানের কারাগারে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর চোখের সামনেই কবর খনন করা হয়েছিল। অথচ তিনি অকপটে বলেছিলেন তাঁর লাশটি বাংলার মাটিতে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তাব তিনি ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলাে; ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে স্বাধীন বাংলার মাটি ছুঁয়ে বজ্রকণ্ঠে বাঙালির জয় ঘােষণা করলেন। শুধু তাই নয়; কবিগুরুর বাঙালি মানুষ না হওয়ার অপবাদটি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সােনার বাংলা পরিণত করার মহান উদ্যোগে তিনি যখন দেশ-গড়ার কাজে নেমে পড়লেন তখন থেকেই পরাজিত শক্তির দোসররা ওতপেতে থাকল।

সম্মানিত সুধী

দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রে বাংলার ভাগ্যাকাশে আবারও নেমে আসলাে দুর্যোগের ঘনঘটা। ১৫ই আগস্ট, তখনও ভাের হয়নি, আজানের ধ্বনি উচ্চারিত হয়নি; ৩২নং সড়কের ৬৭৭নং বাড়িতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘুমন্ত। পরিকল্পনা মাফিক কিছু সংখ্যক দুস্কৃতকারী সামরিক আমলা, ক্ষমতালােভী চক্র বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণ চালায়। ঘাতকের দল ট্যাংক, কামান, মেশিনগানসহ অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে একযােগে তার বাসভবন লক্ষ করে বৃষ্টির মতাে গুলি ছুড়তে থাকে। হঠা বাইরে চিৎকার, হট্টগােল আর গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে বঙ্গবন্ধু পরিবারের। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘাতকেরা চালায় পৃথিবীর সবচেয়ে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। একে একে হত্যা করে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে। নিস্পাপ শিশু রাসেলও রেহাই পায়নি। একজন ঘাতক রাসেলকে উপরতলা থেকে নিচে নিয়ে আসে। ভয়ে কাতর, বিহ্বল হয়ে পড়ে বছরের শিশু রাসেল। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কাঁদতে শুরু করে। কিন্তু ঘাতকের কাছে এই ছােট্ট শিশুর আকুতিতেও পাষাণ গলেনি বরং উপরে নিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এবার স্টেনগান থেকে বঙ্গবন্ধুর বুক লক্ষ করে গুলি করে ঘাতকের দল। তার বুক বিদীর্ণ করে ১৮টি গুলি। হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রােজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর সহােদর শেখ নাসের, কৃষকনেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বেবী সেরনিয়াবাত, সুকান্ত বাবু, আরিফ, আব্দুল নঈম খান, রিন্টুসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্য আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও সেই বিভীষিকাময় রাতে নিহত হন আরও জন। ৩২ নম্বর থেকে যেন সেই রক্তস্রোত বাংলার সবুজ-শ্যামলকে রাঙিয়ে গড়িয়ে পড়ে বঙ্গোপসাগরে; আবহমান বাংলার সমস্ত ঐতিহ্যকে পদদলিত করে এসব কুলাঙ্গার বাঙালির নামে এঁকে দেয় কলঙ্ক তিলক। আর সুযােগের সদ্ব্যবহার করে পরাজিত শক্তি, স্বাধীনতা বিরােধীরা। সম্প্রদায়নিরপেক্ষ বাংলাদেশকে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র নতুন করে এক তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার হীনমানসে লিপ্ত হয়। প্রিয় সুধী চক্রান্ত চলতেই থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে চিরতরে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। বঙ্গবন্ধুর নামকে বাঙালির মনন থেকে মুছে ফেলার জন্য হত্যাকারীদের নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয়। সভ্যতার সবচেয়ে বড়াে লজ্জাকর মানবতাবিরােধী ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ তৈরি করা হয়; ফলে ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার নিষিদ্ধ হয়। ঘাতকেরা প্রচণ্ড দম্ভে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে। আর স্বাধীনতা বিরােধীচক্র, ক্ষমতালিল্লুরা ঘাতকের পক্ষেই দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। ঘাতকদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকেও কলঙ্কিত করে। খুনি চক্রের মূল হােতা খন্দকার মােশতাকসহ ঘাতকরা বাঙালির ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃতির অমােঘ নিয়মে তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

সম্মানিত সুধী

১৯৯৬ সালে জনগণের বিপুল রায়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে; জাতীয় আন্তর্জাতিক দাবির মুখেইনডেমনিটিনামক কালাে আইন বাতিল করে বাংলাদেশ তার কালিমা দূর করতে শুরু করে। অবশেষে প্রায় ২১ বছর পর ১৫ জন ঘাতকের ফাঁসির আদেশের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি কলঙ্ক মুক্ত হয়। ইতােমধ্যে জন ঘাতকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অন্যান্য ঘাতক এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লুকিয়ে রয়েছে। সরকারের প্রতি আমাদের দাবি অনতিবিলম্বে তাদের দেশে এনে বিচার কার্যকর করা হােক।

প্রিয় সুধীবৃন্দ

ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে সােনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন-সাধকে ধূলিসা করতে চেয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলা যায় না; তার অবদান জাতি কখনােই ভুলতে পারে না। বাঙালি জাতির সমস্ত সত্তা জুড়ে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি; বঙ্গবন্ধু শুধু ব্যক্তি নন; বঙ্গবন্ধু এক অনুপ্রেরণার নাম; তিনি স্বাধীন বাংলার স্থপতি জাতির পিতা আমাদের ভাবনা-অনুভাবনায় প্রতিনিয়ত তার দীপ্ত উপস্থিতিই যেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত চরণটির কথা স্মরণ করে দেয়-

নয়ন-সম্মুখে তুমি নাই

নয়নের মাঝখানে নিয়েছে যে ঠাই।

সম্মানিত সুধীমণ্ডলী

জাতীয় শােক দিবসের আলােচনায় আমাকে কিছু বলার সুযােগদানের জন্য উপস্থিত সকলকে এবং এরূপ মহতী আয়ােজনে সংশ্লিষ্ট সকলকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করছি।


Share This Post

Post Comments (0)



Latest Post

Suggestion or Complain

সংবাদ শিরোনাম