ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড নেপাল : ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষের আহাজারি-প্রতিবেদন

সম্প্রতি ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত একটি দেশের অবস্থা উপস্থাপন করে একটি প্রতিবেদন রচনা কর।

প্রতিবেদনের প্রকৃতি          : সংবাদ প্রতিবেদন

প্রতিবেদনের শিরােনাম       : ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড নেপাল : ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষের আহাজারি

প্রতিবেদন তৈরির সময়      : সন্ধ্যা :০০টা

তারিখ                             : ২৬-০৫-২০১৫

সংযুক্তি                      : নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ছবি (৪টি)

ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড নেপাল : ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষের আহাজারি

২৫ মে নেপালের লামজংয়ের পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব কেন্দ্রস্থল থেকে আনুমানিক ২৯ কিমি (১৮ মাইল) ব্যাপী এলাকায় ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৫ কিমি (. মাইল) গভীরে . বা . মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। ১৯৩৪-এর নেপাল-বিহার ভূমিকম্পের পর এটি নেপালে আঘাত হানে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ইউএস জিওলজিকাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পােখারা থেকে ৫০ মাইল পূর্বে ভূপৃষ্ঠের মাত্র কিলােমিটার গভীরে ছিল এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র। ভূমিকম্পকে হিমালয়ান ভূমিকম্প হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে নেপালে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি

নেপালের শক্তিশালী ভূমিকম্পে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকাও কেঁপে ওঠে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসস্তুপে আটকা পড়ে আছে অনেকে। রাজধানী কাঠমান্ডুতে বহু ভবন ধসে পড়েছে। এসব ভবনের মধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘােষিত ধারারা টাওয়ারসহ অনেক পর্যটন কেন্দ্রও রয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি অবস্থা ঘােষণা করেছে নেপাল সরকার। উদ্ধার কাজে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছেন দেশটির তথ্যমন্ত্রী মিনেন্দ্র রিজাল। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নেপালের সহায়তার হাতও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২৬ মে সন্ধ্যা টা পর্যন্ত নেপালের কাঠমান্ডু শহরে ৭৭৭ জন, ভক্তপুর শহরে ২২৪ জন এবং ললিতপুর শহরে ১৫১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপালের মধ্যাঞ্চল বিকাস ক্ষেত্রে ১০১৯ জন, পশ্চিমাঞ্চল বিকাস ক্ষেত্রে ২০৯ জন, পূর্বাঞ্চল বিকাস ক্ষেত্রে ৫০ জন এবং মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল বিকাস ক্ষেত্রে জন ব্যক্তির মৃত্যুর খবর জানা যায়। তবে ধ্বংসস্তৃপের মধ্যে এখনও অনেকে চাপা পড়ে থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি কাঠমান্ডুতেই হয়েছে। নিহতের মােট সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই রাজধানী এলাকার। রাস্তায় বড়াে ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ইউনেস্কো ঘােষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ধারারা টাওয়ারও ধসে পড়েছে। এর নিচেও অনেকে আটকা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাঠমান্ডুর একটি পার্কে ভাস্কর্য ভেঙে তার নিচে চাপা পড়ে এক নারী শিশু নিহত হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই হাত-পা সহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়েছেন। ভূমিকম্পে কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ত্রাণ উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এছাড়াও কাঠমান্ডু দরবার ক্ষেত্রের অট্টালিকা সৌধগুলাে, ধরহরা মিনার, জানকী মন্দিরের উত্তরভাগ, পাট দরবারক্ষেত্র, মনকামনা মন্দির ইত্যাদি স্থাপত্যগুলাে ভূমিকম্পে বহুলাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমিকম্পে কাষ্ঠমণ্ডপ, পঞ্চতলের মন্দির, দশাবতার মন্দির, কৃষ্ণ মন্দির, শিব পার্বতী মন্দিরের দুটি দেওয়াল ইত্যাদি মন্দির স্থাপত্যগুলােও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কুমারী মন্দির, লেজু ভবানী, জয় বাগেশ্বরী মন্দির, পশুপতিনাথ মন্দির, স্বয়ম্ভুনাথ বৌধনাথ স্তুপ, রানি পােখরির রত্ন মন্দির আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া গােখা দরবার, পালনচক ভগবতী, চুরিয়ামি, রানি মহল, ভীমসেন স্থান, নুওয়াকোট দরবার আংশিক বা অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মাউন্ট এভারেস্টে তুষার ধস

ভূমিকম্পের কারণে মাউন্ট এভারেস্টে তুষারধস ঘটে এবং এতে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পর্বতারােহী একটি দল এভারেস্টে ১৮টি মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র। ৬১ জন আটকে পড়া পর্বতারােহীকে উদ্ধার করার কাজ চলছে। গুগলের প্রকৌশলী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিয়েল পল ফ্রেডিনবার্গ তার তিনজন সহকর্মী গুগল আর্থ প্রকল্পের জন্য সমীক্ষা করার সময় তুষারধসে এখানে মৃত্যুবরণ করেছেন। ধসের কারণে এভারেস্টের বেইজ ক্যাম্পের কিছু অংশ বরফের নিচে চাপা পড়েছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভূমিকম্প হওয়ার সময় অন্তত এক হাজার পর্বতারােহী বেইজ ক্যাম্প বা এভারেস্টের চূড়ার পথে ছিলেন। পর্বতগাত্রের উচ্চ ক্যাম্পে অবস্থিত পর্বতারােহীদের সংখ্যা এখনও অজানা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার উদ্ধারকারী একটি দল আজই মাউন্ট এভারেস্টে পৌছেছে। গুরুতর আহত ২২ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকার্য বন্ধ রাখা হয়। অপর একটি হেলিকপ্টার এভারেস্ট ক্যাম্প- থেকে বেশ কয়েকজন আটকে পড়া পর্বতারােহীকে উদ্ধার করে।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলাের ওপর নেপালের ভূমিকম্পের প্রভাব

নেপালে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পটি পার্শ্ববর্তী দেশগুলােতেও বেশ প্রভাব ফেলেছে। নেপালের . মাত্রার ভূমিকম্পে বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকাও কেঁপে উঠে। ভূমিকম্পের ফলে ভারতের বিহারে ৫৬ জন, উত্তরপ্রদেশে ১২ জন, পশ্চিমবঙ্গে জন এবং রাজস্থানে জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া তিব্বতে ১২ জন এবং বাংলাদেশে জনের মৃত্যু হয়েছে।

নেপালের প্রতি অন্যান্য রাষ্ট্রের সহযােগিতা

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালের প্রতি বিভিন্ন দেশ সহযােগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবা মানবিক সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীও দুর্গতদের সাহায্যার্থে বেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান সরকারও নেপালের কর্তৃপক্ষকে সব ধরনের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাও দুর্গতদের উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেছে এবং তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করে সাহায্য করছে।

নেপালের মারাত্মক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে দেশটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবী কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলাে। একটি দেশের জন্য এরূপ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। তবে সময় অতিবাহিত হওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে নেপালও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।


Share This Post

Post Comments (0)



Latest Post

Suggestion or Complain

সংবাদ শিরোনাম